এস এম রফিক সিনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার
অভিভাবকরা
রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের স্বল্পতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাইমারি স্কুল, যেগুলোর বড় অংশ এখন আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—বরং শিক্ষা-নামে লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব স্কুলের সামনে বড় বড় সাইনবোর্ডে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত’ লেখা ঝুলিয়ে অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তবে এই অনুমোদনের প্রকৃতি, পরিধি ও বৈধতা নিয়ে রয়েছে চরম অস্পষ্টতা। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ও জাতীয় শিক্ষানীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ভুক্তভোগী অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেজি শ্রেণিতে ভর্তি বাবদ এককালীন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এর বাইরে রেজিস্ট্রেশন, ফরম, পরীক্ষা, উন্নয়ন ফি ছাড়াও ড্রেস, লোগো, ডায়েরি, টাই, ব্যাজ, আইডি কার্ড, অভিভাবক কার্ড, কোর্স ফাইল, নেমপ্লেট, পিকনিক ও সার্টিফিকেটের নামে একের পর এক খাতে অর্থ আদায় চলছে। কোথাও নেই প্রকাশ্য ফি তালিকা, নেই স্বচ্ছ হিসাব বা নিয়মিত রসিদের নিশ্চয়তা।
মাসিক বেতন গড়ে ২ হাজার ৭শ টাকা নির্ধারণ করায় সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর নেমে এসেছে ভয়াবহ আর্থিক চাপ। অভিযোগ রয়েছে, কোনো অভিভাবক আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানালে বা ফি কমানোর অনুরোধ করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অপমানজনক আচরণ করা হয়, যা শিক্ষকতার নৈতিকতা ও পেশাগত আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।
বিশেষ করে মিরপুর-১২ নম্বর, এ ব্লক, পুরান থানা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত প্যারাডাইস স্কুলকে ঘিরে অভিযোগ আরও গুরুতর। স্থানীয়দের দাবি, একটি মাত্র ভবনেই প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত সব স্তরের পাঠদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই ভবনে একাধিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, অবকাঠামোগত মান, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধি মানা হচ্ছে কি না—তা নিয়ে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন।
এছাড়া ইংলিশ মিডিয়াম, ইংলিশ ভার্সন ও বাংলা ভার্সনের নামে ভিন্ন ভিন্ন ভর্তি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শিক্ষানীতির দৃষ্টিতে বৈষম্যমূলক ও অনিয়মপূর্ণ বলে অভিযোগ সচেতন মহলের।
এলাকাবাসীর মতে, শিক্ষা কার্যক্রমের মান, শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে এসব প্রতিষ্ঠান মূলত অর্থ আদায়কেই মুখ্য লক্ষ্য বানিয়েছে। সরকারি স্কুলের স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিণত করেছে লাভজনক বাণিজ্যে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস, প্রশাসন ও তদারকি সংস্থার কার্যকর নজরদারি দৃশ্যমান নয়। কোথাও কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের নীরব সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে।
অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।শিক্ষার নামে এই লাগামহীন বাণিজ্য ও বিধিবহির্ভূত অর্থ আদায় বন্ধে এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন আশঙ্কাই ঘুরপাক খাচ্ছে মিরপুরবাসীর মনে।